English French German Italian Portuguese Russian Spanish

Related Articles

Search

সংকটে মধুপুর গড়

Print
AddThis Social Bookmark Button

 

 

11th April, 2013

 

 

 

 

দেশের অন্যতম সেরা উদ্ভিদ উদ্যান মধুপুর গড়ের মোট বিস্তার ৪৫ হাজার ৫৬৫ একর হলেও বর্তমানে বনটির আয়তন এসে ঠেকেছে ১০ হাজার ৫০০ একরে।



এই গড়ের দক্ষিণাংশ ভাওয়াল গড় এবং উত্তরাংশ মধুপুর গড় নামে পরিচিত। উত্তর থেকে দক্ষিণে মধুপুর গড়ের জলবায়ুতে সামান্য পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। শীতকালে উত্তরাংশে অধিকতর ঠাণ্ডা বিরাজমান থাকে। গড় তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে ২৮ সে. থেকে ৩২ সে. এর মধ্যে এবং শীতকালে তা ২০ সে. এ নেমে আসে। শীতকালে তাপমাত্রা কখনো কখনো ১০ ডিগ্রি সে. এ নেমে আসে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১,০০০ মিমি থেকে ১৫০০ মি.মি পর্যন্ত। সচরাচর তীব্র ঝড়ঝঞ্ঝা সংঘটিত হয় না, তবে দক্ষিণাংশে টর্নেডো সংঘটিত হতে দেখা যায়। ৫০ বছর আগেও মধুপুর গড় ব্যাপকভাবে বনাবৃত ছিল। বনের প্রধান আকর্ষণ ছিল শাল বা গজারি গাছ। যার ফলে এই বনের নামকরণ করা হয় শালবন। অবৈধভাবে ব্যাপকহারে শালগাছ কাটার ফলে বর্তমানে প্রাকৃতিক বনটির আয়তন এসে ঠেকেছে ১০ হাজার ৫০০ একরে। বাকিঅংশ হয় দখলবাজি হয়েছে, নয়তো ব্যবহার হচ্ছে অন্য কাজে।



অন্যান্য গাছের চেয়ে শালবনে প্রাধান্য ছিল আগুচি নামে গাছটিরও। ২০ বছর আগেও মধুপুর বনে প্রকাণ্ড শাল ও আগুচির দেখা মিলত অহরহ। কিন্তু বর্তমানে তা কেবলই ইতিহাস। বনে বলতে গেলে শাল এবং আগুচি বিরল প্রজাতির পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। দখলবাজি, বনের আদিবৃক্ষ কর্তন, পরিবেশবান্ধব নয় এমন বিদেশি প্রজাতির কিছু গাছ যেমন আকাশি এবং ইউক্যালিপটাস ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক বনায়ন, বিভিন্ন দফতরের নামে বনের জায়গা বরাদ্দকরণ এবং বনভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে রাবার বাগান করায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা মধুপুর শালবন এখন মহাঅস্তিত্ব সংকটে। চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় প্রকৃতি সৃষ্ট বনটি এখন কোনোমতে টিকে আছে।



উদ্যানের ২৫ মাইল থেকে দোনালা পর্যন্ত এবং হরিণধরা থেকে শোলাকরি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল গড়ের শালবন। বনে ছিল বড় বড় শিরিস, শাল, আগুচি, বুত্তুন, হেমলা, পিটকালি, পিতরাজ, কড়াই এবং বাটগাছ যা এখন নেই বললেই চলে। পশুপাখির মধ্যে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টিকেছিল চিতাবাঘ, হরিণ, শূকর, বনমোরগ, টিয়া, ঘুঘু, বক, সারস ও শকুন। অবৈধভাবে গাছ নিধন ও বন্যপ্রাণী শিকারের ফলে বনের পরিবেশ মারাত্দকভাবে হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিঘি্নত হচ্ছে প্রতিবেশ কার্যক্রমও। ২০০ বছর আগেও মধুপুর শালবনে হাতি ও গণ্ডারের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যহারে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই প্রাণী দুটি এ এলাকা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাঘ ও চিতাবাঘের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ বাঘের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে এবং ৫০ বছর আগে একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। চিতাবাঘ বর্তমানে বিলুপ্তির মুখোমুখি। বিভিন্ন প্রজাতির বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, কাঠবিড়ালি, হনুমান এখনো মধুপুর বনে দেখা যায় যত্রতত্র। এক সময় এই বনে প্রচুর সংখ্যক ময়ূর দেখা যেত। কিন্তু ৩০ বছর আগে ময়ূর বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে প্রাণীবিদদের ধারণা।



কোচ এবং মাণ্ডা (গারো) নামে দুই উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাস এই মধুপুর গড়ে। যারা মধুপুর শালবনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আগে বনে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হতো বুনো আলু, জাম, জামরুল, কুলসহ বিভিন্ন জাতের ফল, মাশরুম, ফুল ও শাকসবজি। বনের ভেতরের ঝরনা বা ছড়ায় পাওয়া যেত কৈ, মাগুর ও টাকিসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ। যা ধরে তারা নিজেদের চাহিদা মেটাত। বনের আগুচি গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে উৎসব-আয়োজনে সেই পাতায় করে খাবার পরিবেশন করত উপজাতি গারোরা।



শালবনে বসবাসকারী আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ধারণা শালবনে ব্যাপকভাবে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। বনসংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আগে বনের পরিবেশ অনেক সুন্দর ছিল। বনের ভেতর এবং আশপাশ এলাকার আবহাওযা ঠাণ্ডা ছিল। কারণ হিসেবে বলা যায়, তখন বনে গাছের ঘনত্ব ছিল খুব বেশি। এখন ঘনত্ব কমার সঙ্গে সঙ্গে বড় গাছ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সামাজিক বনের নামে প্রাকৃতিক বন, ফলদ ও ঔষধি গাছের চেয়ে সেগুন ও একাশি গাছের প্রাধান্যই বেশি। এসব গাছের ডালে পাখি বসে না, গাছের নিচে জন্মায় না কোনো লতাপাতা। গাছের পাতা পড়ে তৈরি হয় না জৈবসার। বনের গাছপালা এবং আয়তন কমে যাওয়ায় বৃষ্টিপাতও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে বলে স্থানীয় আদিবাসীদের ধারণা।



সুবিস্তৃত শালবলের প্রান্তসীমায় বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে বন পরিষ্কার করে ব্যাপক সংখ্যায় বনের অভ্যন্তরে বসতি গড়ে তুলেছে। গত ৩০ বছরে মধুপুর গড়ের ভূদৃশ্য এবং বাস্তুসংস্থান ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সাভার থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত বিস্তৃত মধুপুর গড়ের পশ্চিমাংশে বাঙালি জনগোষ্ঠী এক প্রকার স্থিতিশীল কৃষি উদ্যানতাত্তি্বক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এসব এলাকা এখনো অতি উৎপাদনশীল; কারণ এখানে প্রচুর পরিমাণ ফলমূল উৎপাদন হয়। মধুপুর গড় বন্যাযুক্ত বৈশিষ্ট্য হওয়ায় এ এলাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উভয় পাশে গড়ে উঠেছে প্রচুর সংখ্যক হালকা ও ভারী শিল্পকারখানা। সরকার মধুপুর গড়ের সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা গড়ে তুলেছে। যা প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। পৃথিবী যেভাবে ধীরে ধীরে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে, তাতে চারদিকে সবুজের সমারোহ গড়ে না তুললে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে পরিবেশ ও প্রাণী-বৈচিত্র্য বাঁচাতে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা অশেষ। শুধু প্রাকৃতিক বনায়ন নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়, বাড়ির আঙিনায় এমনকি রাস্তাঘাট, সড়ক-মহাসড়কসহ খেতের আইলেও রোপণ করতে হবে বনজ, ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষ। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের পৃথিবী নামক সবুজ শ্যামলিমা।



ক্রমবর্ধমান অস্তিত্ব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে_ ক. রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় থাকা ভূমিগ্রাসীদের দখল থেকে সম্পূর্ণ বনভূমি উদ্ধার করা। খ. জনগণের অস্তিত্ব ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বনসম্পদ সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যক। গ. বাছাইকৃত বৃক্ষ কর্তন ও স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা। ঘ. চিহ্নিত সংরক্ষিত এলাকার বনভূমি সংরক্ষণ জোরদার করা। ঙ. ইটভাটায় বৃক্ষের পরিবর্তে কয়লার ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করা।



অন্যদিকে বনজ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীকুল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাংলাদেশের বনাঞ্চল ১০% থেকে ২০% বৃদ্ধি ও ১০% রিজার্ভ বন সংরক্ষণ করা। কৃষি বনায়নে উৎসাহ প্রদান এবং প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা জরুরি। চোরাকারবারি ও বনচোরদের যোগসাজশ থেকে বনসম্পদ রক্ষার জন্য পাহারা কার্যক্রম জোরদার করে উদ্যানকে তার পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সহযোগিতা করতে হবে। প্রতিবছর বর্ষার আগে পরিবেশবান্ধব দেশি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছপালা পর্যাপ্ত পরিমাণে রোপণ করলে বনের বিস্তৃতি ঘটবে। এর মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে প্রচুর অঙ্েিজন পাওয়া যাবে। বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন মাধ্যমে সহায়তা গ্রহণ করা।





* মোহাম্মদ কবিরুল হাসান

 


 

 

Source: bd-pratidin

 

 


 

 

 

{jcomments on}

| + - | RTL - LTR