English French German Italian Portuguese Russian Spanish

Related Articles

Search

মাথাভাঙ্গা নদী মরা খালে পরিণত : মৎস সম্পদ বিলুপ্ত প্রায়, জেলেরা বেকার

Print
AddThis Social Bookmark Button

 

19th April, 2013

 

 

 

 

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) থেকে নুরুল আলম বাকু : চুয়াডাঙ্গা জেলার নদীর গতি যেমন বিচিত্র তেমনিতাৎপর্যপূর্ণ। পদ্মা নদীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখা চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রধান নদীমাথাভাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদা উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিতহয়ে দামুড়হুদা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী গ্রাম সুলতানপুরের পাশ দিয়ে ভারতে প্রবেশকরেছে। এ নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গা জেলার বিশাল একটি জনপদ। এই নদীকেঘিরেই একসময় এ বিশাল জনপদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্বাহ করতো তাদের জীবন-জীবিকা।বর্তমানে মৎস সম্পদ বিলুপ্ত প্রায়। বেকার হয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন জেলেরা। জানাগেছে, জন্মলগ্নে মাথাভাঙ্গা ছিল পদ্মার প্রধান শাখা। প্রায় ৪০০ বছর আগে গঙ্গা যখনভাগিরথী দিয়ে বয়ে যেত তখন নদীতল বালির পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেলে মাথাভাঙ্গাই প্রধানস্রোত বয়ে নিয়ে যেত। ১৮৭০ সালে ড. থমাস ওল্ড হ্যাম এশিয়াটিক সোসাইটির কার্যবিবরণীতেউল্লেখ করেছেন, ভাগিরথী ও ভৈরবের মধ্যবর্তী জায়গা কালক্রমে নদীবাহিত পলি দিয়ে ভরাটহয়ে যায়। ফলে গতিমাত্রা আরও কমে গিয়ে পদ্মা পূর্বদিকে সরে যায় এবং মাথাভাঙ্গারআবির্ভাব ঘটে। বিখ্যাত সেচ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম উইলকক্সের মতে মাথাভাঙ্গা সেচের জন্যকাটা খাল ছাড়া কিছুই নয়। অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার প্রধান তিনটি নদীর মধ্যেমাথাভাঙ্গা ছিল অন্যতম। মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার নদী হিসেবেই পরিচিত। এ নদী একসময়খুব স্রোতস্বিনী ছিল। জনশ্রুতি আছে, বহু জনপদ গ্রাস করে মানুষের মাথা ভেঙে দিয়েছিলবলে এ নদীর নাম হয় মাথাভাঙ্গা। মতান্তরে উৎসমুখে মূল নদী পদ্মার সাথে সংযোগ নষ্টহয়ে যাওয়া অর্থাৎ মাথা বা মুখ ভেঙে যাওয়ায় এরূপ নামকরণ হয়েছে। তবে কোন এক সময় এনদীটি হাওলিয়া বা হাওলী নামে পরিচিত ছিল। ১৮৬২ সালে তৎকালীন পূর্ববাংলার সাথেকোলকাতার রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই একমাত্র মাথাভাঙ্গা নদীপথেইকোলকাতার সাথে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ছিল। পদ্মা নদী থেকে জলাঙ্গী নদীর উৎপত্তি স্থলেরপ্রায় ১৭ কিলোমিটার ভাটিতে মাথাভাঙ্গা নদীর উৎপত্তি। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গাউপজেলার হাটবোয়ালিয়া ও হাটুভাঙ্গা গ্রামের মাঝ দিয়ে মাথাভাঙ্গা নদী এ জেলায় প্রবেশকরেছে। প্রবেশ করে কিছুদূর আসার পর এ নদীর একটি শাখা বের হয়ে কুমার নদী নামেপূর্বদিকে বয়ে গেছে। মাথাভাঙ্গা আলমডাঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ২৬ ও দামুড়হুদাউপজেলার ১৫ গ্রাম পেরিয়ে দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম সুলতানপুরের পাশদিয়ে ভারতের নদীয়া জেলায় প্রবেশ করেছে। এর পর এ জেলার ১০-১২ গ্রাম পেরিয়ে ভাগিরথীরসাথে মিশে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। মাথাভাঙ্গা নদী ভারতে চুর্ণী নদী নামে পরিচিত। ১৭৭১সালে ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানি মিষ্টার রেনেলকে নদী জরিপ কাজে নিযুক্ত করেন। ১৭৮০ সালেরেনেলের মানচিত্র প্রকাশিত হয়। এতে গ্রীষ্মকালে মাথাভাঙ্গায় বড় নৌকা চলাচলে বিঘœ ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়। ১৭৯৫ সালে মাথাভাঙ্গা নদী জরিপ শেষে সংস্কার করেনৌ-বাণিজ্যের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। ১৭৯৭ সাল পলিজ অবক্ষেপণের কারণে মাথাভাঙ্গারগভীরতা কমে যায়। ১৮১৩ সালে তৎকালীন সরকার মাথাভাঙ্গা সংস্কারের জন্য কর ধার্য করে।১৮১৯-২০ সালে জিকে রবিনসনকে মাথাভাঙ্গার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ও কালেক্টর নিয়োগ করাহয়। অপরদিকে মাথাভাঙ্গার বিপদ হয়ে দাঁড়ায় তারই শাখা কুমার নদী। সেই সময় মাথাভাঙ্গারস্রোতের ৫ ভাগের ৪ ভাগ পানিই কুমার দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মাথাভাঙ্গা বিপদ ত্বরান্বিতহয়ে পড়ে। ১৮২৩ সালে প্রথমবারের মতো বঙ্গদেশে ১০ হাজার ৪০০ পাউন্ড ব্যয়ে গরুচালিতড্রেজিং মেশিন আনা হয়। কিন্তু সে বছর হঠাৎ মাথাভাঙ্গার গতি পরিবর্তন ঘটে। পরে ১৮৮১সালে মাথাভাঙ্গা হঠাৎ নাব্য হয়ে ওঠে। এতে করে পরিষ্কার বোঝা যায় এতদাঞ্চলের নদীরনাব্যতা গঙ্গা ও পদ্মার প্রবাহের উপর নির্ভরশীল।


১৯৬৮-১৯৬৯ সালে ভারত গঙ্গারউপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে এবং ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত ফারাক্কা চালুকরার পরথেকেই অব্যাহতভাবে কমতে থাকে পদ্মার পানি প্রবাহ। তার প্রভাব পড়েমাথাভাঙ্গার উপরও। সেই থেকে মাথাভাঙ্গায় ক্রমান্বয়ে পানি প্রবাহ কমে গেলে পলি পড়েভরাট হতে থাকে নদীটির তলদেশ। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলার কারণে মাথাভাঙ্গা এখন মৃতপ্রায়হয়ে খালের আকার ধারণ করেছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে নদীর পানি প্রবাহ এত কমে যায় যে কোনকোন জায়গায় পানি প্রবাহের উচ্চতা থাকে মাত্র হাটু সমান। অনায়াসে মানুষ হেঁটেই এ নদীপার হয়। বর্তমান সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার এ নদী পুনঃ খননের কথা শোনা গেলেও আজপর্যন্ত তার কোন আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।


চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণঅধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা গেছে, একসময় এ নদীর পানিই ছিল এ অঞ্চলের নদী তীরেরকৃষকদের সেচের একমাত্র অবলম্বন। পানি প্রবাহের অভাবে বছরের পর বছর পলি পড়ে নদীটিতার ঐতিহ্য হারিয়েছে। অন্যদিকে অনাবৃষ্টির কারনে চুয়াডাঙ্গাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকারকৃষি জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। মাথাভাঙ্গা নদীতে পানি না থাকার কারণে চুয়াডাঙ্গাজেলার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে যন্ত্রচালিতসেচযন্ত্রেও পানি ঠিকমতো উঠছে না। কষ্ট করে কৃষকদের পানি তুলতে হচ্ছে। ফলেতুলনামূলকভাবে বেশি খরচ গুনতে হচ্ছে ফসল উৎপাদনে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমেযাওয়ায় খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ও খাল-বিলে পানি থাকছে না। বর্তমানে নদীটি পুনঃখনন করাসময়ের দাবি। তাই এ অঞ্চলের মানুষের দাবি, এক সময়ের খরস্রোতা ও যৌবনবতী বর্তমানেমৃতপ্রায় এ নদীটি পুনঃখনন করে এর স্বাভাবিক স্রোতধারা চালু করে এ অঞ্চলের মানুষেরআর্থসামজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হোক।

 

 

 


 

 

Source: dailyinqilab

 

 


 

 

 

{jcomments on}

| + - | RTL - LTR