English French German Italian Portuguese Russian Spanish

Related Articles

Search

টিপাইমুখ বাঁধঃ বাংলাদেশে সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়

Print
AddThis Social Bookmark Button

মো. হুমায়ুন কবীর

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানার প্রায় ২০০ কিলোমিটার উজানে মণিপুর রাজ্যের বরাক নদীতে টিপাইমুখ নামক স্থানে ‘টিপাইমুখ বাঁধ’ নির্মাণের নিমিত্তে ২২ অক্টোবর ভারতের ন্যাশনাল হাইড্রোপাওয়ার করপোরেশন লিমিটেড (এনএইচপিসি) ও সুতলেজ জলবিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (এসজেভিএন)‘র মধ্যে একটি যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি স্বারিত হয়েছে। ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এই টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। এই বাঁধের উচ্চতা হবে ১৬২ মিটার। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ছয়টি ইউনিট থাকবে, যার প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ২৫০ মেগাওয়াট। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিন্ন নদীকে কেন্দ্র করে একতরফাভাবে কোন একটি দেশ প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে না। প্রকল্প গ্রহণ করার আগে অবশ্যই পুরো অববাহিকার ওপর কী প্রভাব পড়বে তার একটি যৌথ সমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

বাঁধ সম্পর্কে অরুন্ধতি রায় ‘দি গ্রেটার কমন গুড’ এ উল্লেখ করেছেন, “বড় বাঁধের শুরু হর্ষধ্বনিতে আর শেষটা কান্নায়। উন্নত বিশ্বে এগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষকের জ্ঞান তার কাছ থেকে কেড়ে নেবার নিশ্চিত পদ্ধতি। গরীবের পানি, সেচ আর জমি বড়লোকের হাতে উপহার দেবার উদ্ধত পথ। এগুলোর জলাধার মানুষকে করে গৃহহীন, নিঃস্ব। প্রতিবেশগত বিবেচনায় চরম দুর্দশা সৃষ্টিকারী। এগুলো মাটিকে বানায় আবর্জনা। বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, খরা আর রোগের বিস্তার এগুলোর পরিণতি। বড় বাঁধের ভূমিকম্প প্রবণতা বৃদ্ধিরও যথেষ্ট প্রমাণ আছে।”

ভারতের লেখক হিজাম হিরামত সিং ‘টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব: প্রয়োজন পুণর্মূল্যায়ন’ এক নিবন্ধে লিখেছেন, প্রকল্প এলাকায় ২৪০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে একটি লেক তৈরি করা হবে। এখানকার হাজারো মানুষ তাদের জীবিকা হারাবে। এটা সত্য যে, ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এসআই খান বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ হবে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়। এ বাঁধ নির্মিত হলে সুরমা, কুশিয়ারাসহ মেঘনা অববাহিকার নদীগুলোর নাব্যতা হারিয়ে একসময় মরে যাবে। চার কোটির বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হবে।

সুতরাং পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, ভূবিজ্ঞানি, পরিবেশ নিয়ে যারা ভাবেন সবাই একমত, এই টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদী অববাহিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সুরমা ও কুশিয়ারার পানিপ্রবাহ কমে যাবার কারণে মেঘনার পানিপ্রবাহও কমে যাবে। তখন গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী মিলিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গতিশীল মিঠা পানির অববাহিকার দেশ বাংলাদেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। কারণ এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা স্রোতধারার ১৫% পানি আসে মেঘনা নদী দিয়ে।

বাঁধের ফলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের জীবনযাপন বিপর্যস্ত হবে। পানি প্রবাহ কমে যাবার প্রেক্ষিতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্লাবনভূমি হিসেবে গড়ে ওঠা জমির উর্বরতা নষ্ট হবে এবং জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাবে। মাটি তার স্বাভাবিক জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলবে। এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাবে। নদীগুলি ভরাটের কারণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে পূর্বের তুলনায় অত্র অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি হবে অনেক অনেক বেশি। ফলে কৃষির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হবে। বিরাট এলাকার পাহাড়-জঙ্গল পানিতে ডুবে যাবে। জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ কমে গেলে নদী দিয়ে নৌ চলাচল মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসার প্রেক্ষিতে গাছপালা তরুলতা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারবে না। পশুপাখির বিচরণ কমে যাবে। বন ও বন্যপ্রাণী ধ্বংস হবে। নদী-হাওরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাবে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে।
ভূবিজ্ঞানিদের মতে, টিপাইমুখ অত্যন্ত ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। পুরো বরাক অববাহিকায় অসংখ্য ফাটল ও চ্যুতি রয়েছে, যা শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য সহায়ক। আর এই ফাটল ও চ্যুতি উক্ত এলাকার নদীগুলোর গতিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাছাড়া ভারত ও মিয়ানমার টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের জন্যও এলাকাটি পৃথিবীর একটি অন্যতম ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই অঞ্চলে গত ১৫০ বছরে রিক্টার স্কেলে ৭ এর অধিক মাত্রার দুটি ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯৫৭ সালের ভূমিকম্পটির অবস্থান ছিল টিপাইমুখ প্রকল্প থেকে পূর্ব-উত্তর-পূর্ব দিকে মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে। ফলে একটি বড় বাঁধের কারণে এখানে ভূমিকম্প হলে বা কোন কারণে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে সঞ্চিত জলরাশি, পলিমাটি প্রভৃতির মাধ্যমে অধিবাসীদের মারাত্মক ক্ষতি হবে। হাজার হাজার মানুষ তাদের আবাসস্থল ও জীবিকা হারাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে যেমন বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ গোটা এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে তেমনি টিপাইমুখ বাঁধের কারণেও একসময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ সারাদেশই পরিবেশগত বিপর্যয়/অবক্ষয়ের সম্মুখিন হবে।

লেখকঃ প্রভাষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সরকারি এম এম কলেজ, যশোর।
This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.
 
http://www.sonarbangladesh.com/writer/MdHumayunKabir

 

 

 


Source : Amar Shonar Bangla

| + - | RTL - LTR