English French German Italian Portuguese Russian Spanish

Related Articles

Search

মরে গেছে প্রমত্তা তিস্তা : ভেঙে গেছে তিস্তাপাড়ের মানুষের স্বপ্ন

Print
AddThis Social Bookmark Button
আবদুর রাজ্জাক নীলফামারী, হাসান-উল আজিজ লালমনিরহাট
{jcomments on}
 
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী প্রমত্তা তিস্তা মরে গেছে। তিস্তার বুকজুড়ে শুধুই ধু-ধু বালুচর। পানির অভাবে নাব্য হারিয়ে তিস্তা বালুচরে রূপ নিয়েছে। তিস্তাকে দেখলে এখন নদী বলে মনেই হয় না। এককালের স্রোতস্বিনী তিস্তায় যতদূর চোখ যায় শুধু বালু আর বালু। প্রকৃতির কোলে সৃষ্ট এ পাহাড়িকন্যা তিস্তাকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে এ নদীর দুর্বার গতি রুদ্ধ করা হয়েছে। একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে এ করুণ পরিণতির সৃষ্টি করেছে। যে নদীর বুক চিরে একসময় বড় বড় সওদাগরী নৌকা, পাল তোলা নৌকা, ডিঙি নৌকা চলত, সে নদীতে এখন ছোট একটি নৌকারও দেখা পাওয়াই কঠিন। হিমালয় পাহাড়ের চো-লামু-লেক থেকে তিস্তার উত্পত্তি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১৭ হাজার ৫০০ ফুট। অধিক উচ্চতার কারণে উজানে তিস্তার গতি দুর্বার। ১৯৭৭ সালে ভারতের গজলডোবায় প্রথমবারের মতো বাঁধ নির্মাণ করে ভারত তিস্তার মূল স্রোতকে বিঘ্নিত করে ভারতের পশ্চিমের বিভিন্ন রাজ্যে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে পুরোপুরি তিস্তার পানি প্রত্যাহারের ফলে শুধু তিস্তার নিজস্ব জোয়ারের পানির ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। পরিণামে আজ তিস্তা পেয়েছে মৃত নদীর পদবি। পানি চুক্তির আশা কিছুটা উজ্জ্বল হলেও বর্তমানে মমতা দিদির নির্মমতায় তিস্তাপাড়ের লাখ লাখ মানুষ আজ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তিস্তা নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ছাতনাই গ্রাম দিয়ে বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে। পরে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশতে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিত্রম করেছে তিস্তা। এ দীর্ঘ পথচলায় তার দু’তীরে গড়েছে অসংখ্য বসতি। জুগিয়েছে লাখো মানুষের জীবিকা। আবার ভেঙেছে অসংখ্য জনপদ যাদের করুণ অশ্রু মিশেছে গিয়ে তিস্তার জলে। আজ পানির অভাবে তিস্তা পরিণত হয়েছে শীর্ণকায় খালে। এর ফলে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। সমগ্র উত্তরাঞ্চলে দ্রুত মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে জীববৈচিত্র্যে। তিস্তার পানি শূন্যতার কারণে কমে গেছে ফসলের উত্পাদন। ভূ-গর্ভস্থ পানি তোলার কারণে ওই পানিতে আয়রনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কৃষিতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই কৃষককুলের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে তিস্তার পানিপ্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নদীর প্রবাহ বজায় রাখতে ৪ হাজার কিউসেক পানির পরিবর্তে ব্যারাজ এলাকায় পানি আছে মাত্র ২০০ কিউসেক, যা ব্যারাজের ভাটিতে আরও কম থাকায় তিস্তা এখন মরাখাল। সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তার বুকে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পলি জমে চর জেগে উঠেছে। নাব্য কমে যাওয়ায় দেশের সর্ববৃহত্ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের সেচ কার্যক্রমও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ব্যারাজের ডালিয়া ডিভিশনের প্রকৌশলীরা জানান, বর্তমানে সর্বকালের সবচেয়ে কম পানিপ্রবাহ তিস্তায় বিরাজ করছে। এসময় ব্যারাজের উজানে ১০ হাজার কিউসেক পানিপ্রবাহ থাকার কথা। এলাকাবাসী জানান, সীমান্ত জেলা লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামসহ রংপুর-রাজশাহী অঞ্চলের জেলাগুলোতে পানির অভাবে সেচ দিতে না পেরে আবাদ নিয়ে চরম সঙ্কটে পড়েছেন এসব অঞ্চলের কৃষকরা জেআরসির তথ্যমতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিস্তায় পানির প্রবাহ ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কিউসেকেরও বেশি। আর এবার একই মাসে তা ২০০ কিউসেকে নেমে এসেছে। এভাবে প্রতিনিয়ত পানি কম পাওয়ায় ধু-ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে তিস্তা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি নয়াদিল্লি সফরে তিস্তার পানিবণ্টনে দ্রুত একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছিলেন। এরপর ২০১০ সালের ১৭ মার্চ যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সচিব পর্যায়ের বৈঠকে চুক্তির খসড়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গত বছর দু’দেশের পানিসম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চুক্তির খসড়া তৈরি করার পর দু’দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যুক্তিতর্কের পর চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে—এটা সবাই নিশ্চিত ছিল। কিন্তু মমতার প্রবল আপত্তিতে তা হিমঘরে চলে যায়। ভেঙে যায় তিস্তাপাড়ের মানুষের বহুদিনের স্বস্বপ্ন।
| + - | RTL - LTR